আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম এর জীবনী

 

আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম
ছবিঃ কিশোরগঞ্জ নিউজ


নামঃ আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম
পেশাঃ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি
জন্মঃ ১ আগস্ট, ১৯২৮ ইং
জন্মস্থানঃ ভাগলপুর গ্রাম
(ভাগলপুর, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ)
মৃত্যুঃ ১৯ অক্টোবর, ১৯৯৫ ইং


জহুরুল ইসলামের জন্ম এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। জন্মগতভাবেই জহুরুল ইসলাম এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের ধারক ও বাহক। মুঘল আমলের মধ্য ভাগে জহরুল ইসলামের পূর্বপুরুষ তিন ভাই বাজেত খাঁ, ভাগল খাঁ ও দেলোয়ার খাঁ মুঘলশাহের দরবারি আমলা হয়ে এই এলাকায় আসেন। পরে বাজেত খাঁর নামানুসারে বাজিতপুর, ভাগলখাঁর নামানুসারে ভাগলপুর ও দেলোয়ার খাঁর নামানুসারে বর্তমান দিলালপুর নামকরণ হয়।


জহুরুল ইসলাম ভাগলখাঁর পরিবারের ত্রয়োদশ বংশধর। তার জন্ম কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার ভাগলপুরে ১৯২৮ সালের আগস্টে। তার পিতা আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন জেলার পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৮ সাল থেকে টানা ১০ বছর বাজিতপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন।


ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের তৎকালীন সর্ববৃহৎ জেলা ময়মনসিংহের বাজিতপুর সদর থানার ভাগলপুর গ্রামে এক স্বচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট জন্ম নিয়েছিলেন আজকের দিনের এক কিংবদন্তি পুরুষ আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম।


শিক্ষাজীবন: গরীব দুঃখীদের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করার স্বভাব ছিলো ছোটবেলা থেকেই। স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিনের জন্য সরারচর শিবনাথ হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন। সেখান থেকে স্কুল পরিবর্তন করে বাজিতপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। লেখাপড়ার এক পর্যায়ে চাচার সাথে কোলকাতা চলে যান। সেখানে রিপন হাইস্কুল থেকে ইংরেজী মিডিয়ামে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করে বর্ধমান কলেজে ভর্তি হন।


পরে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে ভর্তি হয়ে মেধা থাকা সত্ত্বেও খরচ জোগার করতে না পারার কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি উনার। ১৯৪৮ সালে ৮০ টাকা মাসিক বেতনে সিএন্ডবির ওয়ার্ক এসিস্টেন্ট হিসেবে তিন বছর চাকরি করেন। এরপর তিনি নিজে ছোটখাটো ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন।


কর্মজীবন: শিক্ষাজীবন সাধারণ হলেও কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখার সুযোগ হয়তো জহুরুল ইসলাম সাহেব পাননি। কিন্তু কর্মজীবনে তিনি ছিলেন অতুলনীয় কৃতিত্বের অধিকারী। বিন্দু থেকে সিন্ধু কিংবা চারাগাছ থেকে মহীরুহ প্রবাদটি সার্থকতা পেয়েছে উনার কর্মজীবনে।

জীবন শুরু করেছিলেন একজন ঠিকাদার হিসেবে। এ জীবনেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই জনপদের সবচাইতে বড় শিল্পপতি হিসেবে। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে সম্ভবত তিনিই প্রথম ও প্রধান বাঙ্গালি শিল্পোদ্যোক্তা, যিনি পশ্চিমা শিল্পপতিদের সমান্তরালে হেঁটেছেন। তার সৃষ্টির পরিধি বিশাল। শিল্প কারখানার পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন বিদ্যাপিঠ, কৃষি খামার, ওষুধ তৈরির কারখানা, আধুনিক হাসপাতাল, ব্যাংক- আরো কতকিছু। এদেশে এপার্টমেন্ট ব্যবসার পথিকৃৎ তিনি।


দেশের সীমানা পেরিয়ে আরব দুনিয়ায় গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন জনপদ, শহর আর উপশহর। তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে অর্জিত আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করেছেন গণমানুষের কল্যাণে।


অপরিকল্পিত, দূষণযুক্ত, রাস্তাবিহীন শহরের বিপরীতে তিনি প্রথম গড়ে তুলেছেন বেশ কিছু আবাসিক প্রকল্প, এপার্টমেন্ট ভবন। তার প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড, ইস্টার্ন টাওয়ার, ইস্টার্ন ভিউ, ইস্টার্ন পয়েন্ট, ইস্টার্ন ভ্যালি, ইস্টার্ন নিকুঞ্জ- প্রভৃতির মাধ্যমে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন লাখ লাখ পরিবারকে। শহরের আশে পাশে গড়ে তুলেছেন পল্লবী ইস্টার্ন মল্লিকা, আফতাবনগর আবাসিক প্রকল্প, রুপনগর আবাসিক, গোড়ান, বনশ্রী, নিকেতন, মহানগর, গারাডোগা, মাদারটেক, মায়াকুঞ্জ নামে আবাসিক প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ছোট, বড়, মাঝারি আকারের কয়েক হাজার প্লট আছে। এসব প্রকল্পে একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, শিশুপার্ক, সুপার মার্কেটসহ নানা নাগরিক সুবিধা রাখা হয়েছে।


বলা যায় যে, ঢাকার নগরায়নে একটি বড় অংশের উন্নয়ন জহুরুল ইসলাম সাহেবের অবদান। তিনি প্লট-ফ্ল্যাটের পাশাপাশি ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে তোলেন ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, ইস্টার্ন প্লাসের মতো অত্যাধুনিক শপিংমল। জহুরুল ইসলাম ঢাকার অদূরে সাভারে ১২শ’ একর ও পাশেই ১৫শ’ একর জমি কিনে নিয়েছেন আবাসন ব্যবসার জন্য।


তিনি দেশের পাশাপাশি আবুধাবীতে ৫ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অত্যাধুনিক ইট নির্মাণ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। ইরাকে বিখ্যাত সিটি সেন্টার ও আব্দুল কাদির জীলানী (রহ.) এর মাজার শরীফ কমপ্লেক্সের পাশে একটি আধুনিক মানের গ্রস্ট হাউস সহ অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেন। এই সময় তিনি বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের শ্রমিক নেওয়ার পথ উন্মুক্ত এবং সুগম করেন। মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার বাংলাদেশীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেন। তার নিজ জন্মস্থান বাজিতপুর হয়ে উঠেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাঝারী শিল্পের নগরী, কৃষি খাতে এনেছেন আমূল পরিবর্তন।


তিনি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা সিটি করপোরেশন ভবন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল, জীবনবীমা ভবন, সাধারণ বীমা ভবন, টয়োটা ভবনসহ বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ছাড়াও তিনি নাভানা গ্রুপ লিমিটেড, আফতাব অটোমোবাইলস, নাভানা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ঢাকা ফাইবারস লিমিটেড, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড, দি মিলনার্স ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, ইস্টার্ন এস্টেটস লিমিটেড, ভাগলপুর ফার্মস লিমিটেড, এসেনশিয়াল প্রোডাক্টস লিমিটেড, ইসলাম ব্রাদার্স প্রোপারটিস লিমিটেড, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেড, আফতাব ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড, আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেড, উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড গড়ে তুলেছেন উনি। তার নিজ জন্মভূমি বাজিতপুরের মানুষদের কর্মসংস্থানের জন্য বাজিতপুরে গড়ে তুলেন অর্ধশতাধিক ফার্ম।


শৈশবে জহুরুল ইসলামের ডাক নাম ছিলো ‘সোনা’। যৌবনে পরিচিত কাছের মানুষেরা ডাকতো ‘জহুর ভাই’ বলে। আর ব্যবসা ক্ষেত্রে সবার কাছে ‘চেয়ারম্যান সাহেব’ হিসেবে পরিচিতি পান জহুরুল ইসলাম সাহেব।


স্বাধীনতা পূর্ববর্তী আন্দোলন সংগ্রাম এবং জহুরুল ইসলাম: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান সরকারের জেলে আটক বাঙালি নেতাকর্মীদের মামলা, আহতদের চিকিৎসা ও পারিবারিক খরচ নিভৃতে বহন করেছেন। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলার খরচও তিনি ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছেন।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধ এবং আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম: আত্মপ্রচারে বরাবরই বিমুখ ছিলেন তিনি। এদেশের মানুষ হয়তো একারণেই তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জ্ঞাত নয়। এ মানুষটিকে নিয়ে গবেষণা অতি জরুরী। রাষ্ট্র, সমাজ আর মানুষের কল্যাণে এই মানুষটির অবদান প্রচারিত হতে হবে তার সুনাম ছড়িয়ে দিতে নয়- বরং মানুষকে উজ্জীবিত করতে- জন্মের যে ঋণ তা শোধ করতে হয় কিভাবে তা জানাতে।


এই জনপদে নানান সময়ে গড়ে উঠা আন্দোলন সংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাই ভালো করে বলতে পারবেন রাজনীতির অঙ্গণ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে কিভাবে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন প্রতিটি কর্মযজ্ঞে।


১৯৭১ সালের জাতির জীবনের দুর্বিষহ দিনে জহুরুল ইসলাম পালন করেছেন তার পবিত্র ও সঠিক দায়িত্ব। এই জনপদে গড়ে তোলা তার শিল্প কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য তার সব মায়া ত্যাগ করে তিনি চরম ঝুঁকি নিয়ে দেশান্তরী হয়েছিলেন হায়েনাদের থাবা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার কর্মযজ্ঞে শামিল হতে।


তিনি ১৯৭১ সালের ৩রা জুন পাকবাহিনীর হাতে আটক হন এবং মুক্তি পাওয়ার পর ১০ জুন লন্ডন চলে যান এবং সেখানে “সুবেদ আলী” ছদ্মনাম ধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনার সিংহভাগ অর্থই তিনি প্রদান করেন।


দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্নভাবে গোপনে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃবৃন্দের কাছে অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন। এমনিভাবে তিনি সকল রাজনৈতিক অভিলাষ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধে থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে নিভৃতে নিজেকে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকের ভূমিকা পালন করেন।


জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ এবং একজন স্বপ্ন বাস্তবায়নের কারিগর: জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ছিলো আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম সাহেবের বড় আবেগের জায়গা। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন এবং আমরা তার স্বপ্নের ফসল, ধারক ও বাহক। জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ আমাদেরও বড় বেশি আবেগের জায়গা।। জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং জহুরুল ইসলাম নার্সিং কলেজ স্থাপিত হয় আফতাব-রহিমা ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের অধীনে। প্রথম দফায় ১৯৮৯ সালে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল স্থাপিত হয় বর্তমানে যার শয্যা সংখ্যা ৫০০ এর অধিক। জহুরুল ইসলাম সাহেবের ইচ্ছা ছিলো মেডিকেল কলেজের পাশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার, যদিও সেটা জনশ্রুতি সম্ভবত।


আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম মাত্র ৬৭ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।

(সংক্ষিপ্ত)


সূত্রঃ kishoreganjnews.com

No comments

Powered by Blogger.